ভর্তুকি মূল্যে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) পণ্য বিক্রি কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর রাজধানীতে টিসিবি পণ্য বিক্রির ট্রাকের সামনে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন। অনেক স্থানে ডিলারদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছেন কেউ কেউ। কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা।
দুই মাস বিরতির পর ১০ আগস্ট রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় টিসিবির ট্রাক সেল কার্যক্রম শুরু হয়। টিসিবির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতে ৬০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাক, চট্টগ্রামে ২৫টি, গাজীপুরে ছয়টি, কুমিল্লা মহানগরীতে তিনটি ট্রাক, এছাড়া ঢাকা, কুমিল্লা, ফরিদপুর, পটুয়াখালী ও বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন স্থানে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি চলছে। প্রতিটি ট্রাকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ জনের কাছে পণ্য বিক্রির ঘোষণা দেয়া হয়। ভর্তুকি মূল্যে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে টিসিবির তিনটি পণ্য বিক্রি হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে দুই লিটার ভোজ্যতেল ২৩০ টাকা, এক কেজি চিনি ৮০ টাকা এবং মসুর ডাল দুই কেজি ১৪০ টাকা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরজমিনে দেখা গেছে, ট্রাকের খোঁজে নিম্ন আয়ের মানুষ ভোর থেকে রাস্তার ধারে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। অনেক সময় বেলা ১১টার পর ট্রাক আসে, আবার কিছু স্থানে নির্ধারিত ট্রাক না আসায় মানুষ খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিরা ভিড় সামলাতে না পেরে পণ্য কিনতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
রাজধানীর তোপখানা রোডে প্রেস ক্লাবের সামনে উত্তম নগর ট্রেডার্স ট্রাকের মাধ্যমে টিসিবির পণ্য বিক্রি করে। এখানকার বিক্রেতা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেয়া হয় ৫০০ জনের পণ্য। কিন্তু লাইনে দাঁড়ায় এর চেয়ে অনেক বেশি। প্রতিদিনই ২০০ থেকে ২৫০ জনকে পণ্য না দিয়েই চলে যেতে হয়। এখন আমাদের যা দেয়া হয়, তার বাইরে কীভাবে দেব? অনেকেই এটা বুঝতে চান না। বাকবিতণ্ডা করেন।’
শাহবাগের বারডেম হাসপাতালের পাশে টিসিবির পণ্য বিক্রি করে মেসার্স আব্দুর রব রাইস এজেন্সি। এখানকার বিক্রেতাও একই অভিযোগ করেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের পণ্যের পরিমাণ অথবা ট্রাকের সংখ্যা বাড়িয়ে দিলে এ সমস্যা হবে না। আগে থেকেই কী পরিমাণ মানুষ আছে, সেটি যাচাই করে পণ্য দিতে পারে। যেন কেউ খালি হাতে ফিরতে না হয়।’
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৫ লাখ পরিবারের কাছে স্মার্ট কার্ড সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে সক্রিয় আছে ৫৪ লাখ। অর্থাৎ এ সংখ্যক পরিবার বর্তমানে টিসিবির পণ্য কিনতে পারছেন। মোট এক কোটি পরিবারের কাছে স্মার্ট কার্ড সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
শাহবাগে টিসিবির পণ্য কিনতে আসা ৭০-ঊর্ধ্ব আব্দুল হাই বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লাইনের সামনে গিয়ে দেখি ট্রাক চলে যাচ্ছে। সকালে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখন তো দুপুর হয়ে গেল, কিন্তু পণ্য পেলাম না।’
প্রেস ক্লাবের সামনে রহিমা বেগম নামে এক বৃদ্ধা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সকাল থেকে দাঁড়িয়ে দুপুরের পর এসে কিনতে পারলাম। গাড়িও আসছে অনেক দেরিতে। আজ আর কাজে যাওয়া হলো না। এখানে কিনতে আসলে আর সেদিন অন্য কাজ করতে পারি না। সারাদিন এখানেই কেটে যায়।’
টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ূন কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবার বাজার দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ডালের দাম ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সামনে যদি কম দামে কিনতে পারি, তাহলে আমরাও কম দামে বিক্রি করব। বরাদ্দ কিছুটা কমানো হয়েছে কারণ দেশের আরো কয়েকটি বিভাগীয় শহরে টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ভর্তুকি কার্যক্রমে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। সামনে এ উদ্যোগ আরো সম্প্রসারিত করা হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে টিসিবির ট্রাক ও পণ্য সরবরাহ দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন। তাদের মতে, শুধু টিসিবির ওপর নির্ভর করলে সংকট নিরসন সম্ভব নয়। বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। এতে সাধারণ মানুষ খোলাবাজার থেকে নিত্যপণ্য কিনতে পারবে এবং টিসিবির ওপর অতিরিক্ত চাপও কমবে।